সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ভূমিকম্প হলে সনাতন ধর্মে উলুধ্বনি ও শঙ্কধ্বনি দেওয়া হয় কেন? — শাস্ত্র মতে তার ব্যাখ্যা?


 ভূমিকম্প হলে সনাতন ধর্মে উলুধ্বনি ও শঙ্কধ্বনি দেওয়া হয় কেন? — শাস্ত্র মতে প্রতিবেদন


সনাতন ধর্মে উলুধ্বনি (উলু) ও শঙ্কধ্বনি শুধু সামাজিক প্রথা নয়—এর শক্ত ভিত্তি রয়েছে বেদ, পুরাণ, তন্ত্র, ধর্মশাস্ত্র ও আচার-বিধিতে। প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা অশুভ ঘটনার সময় এসব ধ্বনিকে শক্তি-বর্ধক, অশুভ-দূরীকরণী এবং শুদ্ধিকর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।



---


🔶 ১. শাস্ত্রে শঙ্খধ্বনির শক্তি ও প্রভাব


➤ (ক) শঙ্খের উল্লেখ – বেদে


বেদে শঙ্খধ্বনিকে বলা হয়েছে “দৈব শক্তির ঘোষণা”।


ঋগ্বেদ-এ শঙ্খের শব্দকে

“পাপনাশী ও ঋণাত্মক শক্তিনাশী” বলা হয়েছে।

শঙ্খের শব্দ পরিবেশকে শুদ্ধ ও পবিত্র করে—এটি একটি দৈবিক কম্পন সৃষ্টি করে।


➤ (খ) পুরাণে ভূমিকম্প বা দুর্যোগে শঙ্খ বাজানোর নির্দেশ


ব্রহ্ম বৈবর্ত পুরাণ, বিশ্ণু পুরাণ ও আগম শাস্ত্রে উল্লেখ আছে:


> “দৈব-দূত বা অশুভ-প্রভাবে প্রকৃতি কেঁপে উঠিলে

শঙ্খধ্বনি করিলে সেই দোষ নাশ হয়।”




অর্থাৎ দুর্যোগ, ভূমিকম্প, ঝড়, অশুভ লক্ষণ—এগুলোর সময় শঙ্খধ্বনি দিয়ে

অশুভ প্রবাহ নিবারণ করতে বলা হয়েছে।


➤ (গ) তন্ত্রশাস্ত্র


তন্ত্র বলে:


> “শঙ্খধ্বনিঃ ভূতপ্রেতবিনাশিনী।”




শঙ্খ ধ্বনি ভূত-প্রেত, অপদেবতা ও নেগেটিভ শক্তি দূর করে।

দুর্যোগে মানুষের ভয় ও মানসিক অস্থিরতা কমায়।



---




🔶 ২. উলুধ্বনির শাস্ত্রীয় ভিত্তি


উলুধ্বনি মূলত শক্তিদেবীর আরাধনা থেকে এসেছে।

তন্ত্র ও দেবীভাবনায় এটি নারীর শক্তির প্রতীক।


➤ (ক) দেবী অংশে উলুধ্বনি বাধ্যতামূলক


চণ্ডী, কালীকাপুরাণ, তন্ত্রসার, দেবী ভাগবত–এ উল্লেখ আছে:


> “যখন শক্তির আহ্বান, বিজয়, বা অশুভ নাশের সময়—

উলুধ্বনি দিয়ে পরিবেশ শুদ্ধ করা উচিত।”




ভূমিকম্পকে অশুভ বা অস্থিরতার লক্ষণ ধরা হয়, তাই এই ধ্বনি দেওয়া হয়।


➤ (খ) উলুধ্বনি শুভশক্তি জাগ্রত করে


তন্ত্র মতে উলুধ্বনি হলো:


শক্তির প্রকাশ


ভয় দূর করা


বিজয় ঘোষণা


অশুভ শক্তি নাশ



বিশেষ করে দেবী আরাধনার সময় এটি সুরক্ষা-কবচ হিসেবে ধরা হয়।



---


🔶 ৩. দুর্যোগে ধ্বনি দেওয়ার শাস্ত্রীয় কারণ


শাস্ত্রে কয়েকটি মূল কারণ উল্লেখ আছে:


১️⃣ “দৈবিক শক্তির প্রলয়” বোঝাতে কম্পন হলে ঈশ্বরকে স্মরণ


ভূমিকম্পকে শাস্ত্রে বলা হয়েছে প্রাকৃতিক দেবতার ক্রিয়া—

এসময় শঙ্খধ্বনি দিয়ে ঈশ্বরের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।


২️⃣ শুদ্ধ শক্তির পরিবেশ সৃষ্টি


শঙ্খ ও উলুধ্বনি দুটোই শব্দতত্ত্ব অনুসারে ইতিবাচক শক্তি ছড়ায়।

ঐশ্বরিক কম্পন ভূমিকম্পের নেতিবাচক কম্পনকে মানসিকভাবে পরাজিত করে।


৩️⃣ মানুষের মনোবল দৃঢ় করা


অনেক শাস্ত্রে উল্লেখ আছে—

দুর্যোগে ভয় দূর করা মানেই অর্ধেক বিপদ কেটে যাওয়া।

উলুধ্বনি ও শঙ্খ মানুষের মন থেকে ভয় কমায়।



---


🔶 ৪. সনাতন ধর্মে শব্দই শক্তি — শাস্ত্রীয় ভিত্তি


সামবেদ বলে:


> “শব্দ ব্রহ্ম।”

অর্থাৎ শব্দই ঈশ্বর।







শঙ্খধ্বনি হলো সেই শব্দের সবচেয়ে পবিত্র রূপ।


মহাভারতেও বলা হয়েছে:


> “শঙ্খের শব্দ শুনিলে অশুভ শক্তি পালায়

এবং দেবীয় শক্তি জাগে।”





---


🔶 উপসংহার (শাস্ত্রীয় সার)


ভূমিকম্পে উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনি দেওয়ার কারণ শুধু সংস্কৃতি নয়—

শাস্ত্রীয় আদেশ, আধ্যাত্মিক শক্তি, শব্দতত্ত্ব ও পবিত্রতার ধারাবাহিকতা।


শাস্ত্রমতে এসব ধ্বনি:


অশুভ শক্তি নাশ করে


পরিবেশ শুদ্ধ করে


মানুষের ভয় দূর করে


দেবীয় সুরক্ষা আহ্বান করে


শক্তি (শক্তি-তত্ত্ব) জাগ্রত করে



এ কারণে সনাতন ধর্মে ভূমিকম্প বা যেকোনো বিপদের সময় উলুধ্বনি ও শঙ্কধ্বনি দেওয়া অত্যন্ত শুভ ও ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য।




মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

মন্দাকিনী মহাতীর্থ পরিচালনা পরিষদের উদ্যোগে মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী উপলক্ষে মন্দাকিনী স্নান আগামী ১৬ মার্চ

  আগামী ১৬ ও ১৭ মার্চ ২০২৬খ্রি. সোম ও মঙ্গলবার প্রতি বছরের ন্যায় এবারও মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে সনাতনী সম্প্রদায়ের মহাতীর্থ মন্দাকিনী স্নান, শ্রীশ্রী শিব ও গঙ্গা পূজা, শ্রীশ্রী বিশ্বশান্তিযজ্ঞ, কবিগান এবং লোকজ মেলা হাটহাজারী উপজেলার অন্তর্গত ফরহাদাবাদ মন্দাকিনী শ্রীশ্রী শিব মন্দির প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠান সূচির মধ্যে রয়েছে ১৬ মার্চ শ্রীশ্রী গঙ্গা পূজা ও শ্রীশ্রী শিব পূজা, শ্রীশ্রী চণ্ডীপাঠ, শ্রীশ্রী বিশ্বশান্তি গীতাযজ্ঞ শুভারম্ভ, মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশীর মন্দাকিনী স্নান ও তর্পণ শুরু, আনন্দ বাজারে মহাপ্রসাদ আস্বাদন,  ধর্মীয় আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কবিগান ও আনন্দ বাজারে মহাপ্রসাদ আস্বাদন। ১৭ মার্চ মধুকৃষ্ণ ত্রয়োদশীর বারুণী স্নান ও তর্পণ শুরু, শ্রীশ্রী শিব পূজা, শ্রীশ্রী বিশ্বশান্তি চণ্ডীযজ্ঞ শুভারম্ভ, বিভিন্ন মঠ ও আশ্রমের মহাত্মা মহারাজ বৃন্দ, আনন্দ বাজারে মহাপ্রসাদ আস্বাদন। অনুষ্ঠানে পৌরহিত্য করবেন শ্রীমৎ উজ্জ্বলানন্দ ব্রহ্মচারী। ১৬ মার্চ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন চট্টগ্রাম-২ ফটিকছড়ি আসনের মাননীয় এম.পি আলহাজ্ব মো. সরোয়ার আলমগীর। ১৭ মার্চ অনুষ্ঠা...

হিন্দু মেয়েরা প্রেমের ফাঁদে পড়ে ধর্মান্তরিত হয়ে যায়, এর সমাধান কি হতে পারে?

  হিন্দু মেয়েরা প্রেমের ফাঁদে পড়ে ধর্মান্তরিত হয়ে যায়, এর সমাধান কি হতে পারে? উত্তর: এই ভারত উপমহাদেশে অহিন্দুদের ধর্ম বিস্তারের প্রধান হাতিয়ার ছিল হিন্দু মেয়ে বিবাহ করা। হাজার বছর আগে থেকে হিন্দু রাজাদের একের পর এক পরাজিত করে, তাদের স্ত্রী এবং কন্যাদের জোড় করে ধর্মান্তরিত করে বিবাহ করেছে। সাধারণ জনগণকে বাধ্য করা হয়েছে। পরাধীন হিন্দুগণ জান-মালের ভয়ে, অস্তিত্ত্ব ও জীবন রক্ষার্থে অহিন্দুর ধর্ম গ্রহণ করেছে অথবা নির্যাতন, ধর্ষণ, লুণ্ঠন বা মৃত্যুকে স্বীকার করে নিত। হিন্দু মেয়েদের জোর করে তোলে নিয়ে ধর্মান্তরিত করে বিবাহ করা, যেন ভাত খাওয়ার মত অবস্থা ছিল। বর্তমানেও বহু হিন্দু মেয়েদের একই পরিণীতি হচ্ছে। হয় তাদের জোড় করে তোলে নেওয়া হচ্ছে অথবা প্রেমের ফাঁদে পড়ে নিজেই চলে যাচ্ছে। বর্তমান সমাজে পরেরটা বেশি দেখা যাচ্ছে। আমাদের এখন জানা দরকার, কেন এমন হচ্ছে, কি এর পরিণাম এবং কি এর সমাধান। কেন এমন হচ্ছে: ১। নিজের ধর্ম সম্পর্কে হিন্দু যুবক-যুবতীগণ একেবারেই অজ্ঞ। তাদের পরিবার থেকে সনাতন ধর্মীয় জ্ঞান তাদের দেওয়া হয় না। তাদের শেখানো হয় না তোমাদের একমাত্র সৃষ্টিকর্তা 'ভগবান শ্রীকৃষ্ণ' তোমাদের এ...

হিন্দু যুবক দীপু দাসকে গণপিটুনিতে হত্যা, “ভয়াবহ” বলে নিন্দা জানালেন মার্কিন কংগ্রেসম্যান

হিন্দু যুবক দীপু দাসকে গণপিটুনিতে হত্যা, “ভয়াবহ” বলে নিন্দা জানালেন মার্কিন কংগ্রেসম্যান। ছবি: সংগৃহীত   ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগে ময়মনসিংহে পোশাকশ্রমিক দীপু দাসকে নৃশংসভাবে হত্যা, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্য রো খানা একে ‘ঘৃণা ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ’ বলে আখ্যায়িত করেন ২৯ ডিসেম্বর: বাংলাদেশে হিন্দু যুবক দীপু চন্দ্র দাসকে নৃশংসভাবে গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্য রো খানা। ক্যালিফোর্নিয়ার প্রতিনিধি এই কংগ্রেসম্যান একে ‘ঘৃণা ও বিদ্বেষের ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ’ বলে আখ্যায়িত করে এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে ‘নিঃশর্তভাবে’ প্রতিবাদ জানানো প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে রো খানা লেখেন, “বাংলাদেশে ২৭ বছর বয়সী হিন্দু পোশাকশ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে হত্যার ঘটনা ভয়াবহ। তাঁর পরিবার ও বন্ধুদের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা। ঘৃণা ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ থেকে উৎসারিত এমন জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে আমাদের নিঃশর্তভাবে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাতে হবে।” এই মন্তব্য আসে ময়মনসিংহ জেলার বালুকা এলাকায় ঘটে যাওয়া দীপু দাসের ...